বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর একাধিক বিবাহ করার নেপথ্য কারন কি?

  • Posted: 22/12/2019

সর্বপ্রথম প্রধান একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, পবিত্র কোরআনের ভাষায়, রাসুল (সাঃ) যা কিছুই বলেন এবং যা কিছু করেন না কেন প্রতিটি বিষয়ই মহান আল্লাহর সরাসরি নির্দেশে করেন। রাসুল (সাঃ) নিজে থেকে বা নিজের খেয়াল খুশীমত কিছুই বলেন বা করেন না। "--- তোমাদের সাথী না পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর না বিভ্রান্ত হয়েছে এবং সে মনগড়া (প্রবৃত্তির বশে) কোন কথা বলে না, এতো কেবল প্রত্যাদেশ (ওহী), যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়-----"। সুরা-নাজম-২, ৩, ৪, ৫।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ওনার জীবনের সর্বপ্রথম বিবাহ যখন করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী বিবি খাদিজার (সাঃআঃ) বয়স ছিল ২৬ বছর। এবং এটাও ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা যে, যতদিন হযরত খাদিজা (সাঃআঃ) জীবিত ছিলেন ততদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অন্য কোন বিয়ে করেন নাই। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত খাদিজার (সাঃআঃ) গর্ভেই খাতুনে জান্নাত মা জননী ফাতেমার (সাঃআঃ) জন্ম হয়েছিল। হযরত খাদিজার (সাঃআঃ) প্রতি বিশ্বনবীর (সাঃ) ভালবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল প্রবল। কারন, আমৃত্যু তিনি রাসূলের (সাঃ) পক্ষে ইসলামের জন্য কাজ করেছেন। এমনকি তিনি নিজের বিপুল ধন-সম্পদ ইসলামের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। হযরত খাদিজার (সাঃআঃ) মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শুধু যে সারাক্ষণ তাঁর নাম উচ্চারণ করতেন তাই নয়, হযরত আয়েশার ভাষ্যমতে, রাসূল (সাঃ) হযরত খাদিজাকে আদর্শ স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করাতেন। তবে হযরত খাদিজার (সাঃআঃ) মৃত্যুর পর বিশ্বনবী (সাঃ) মহান আল্লাহর নির্দেশে পুনরায় বিয়ে করেন। ঐতিহাসিকরা রাসূলের (সাঃ) ৯ জন স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেছেন।

তাঁরা হলেন হযরত হাফসা, হযরত আয়েশা, হযরত সাওদা, হযরত মায়মুনা, জেহেশের কন্যা হযরত জয়নাব, হযরত উম্মে সালমা, হারেসের কন্যা হযরত জুয়াইরা, হযরত মারিয়া ও হযরত সুফিয়া। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) জীবনে দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস বা ঋপুর তাড়নার বিন্দুমাত্র কোন স্থান ছিল না।
সাধারণত রাসূল (সাঃ) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে বিবাহগুলো করেছিলেন।

হযরত খাদিজার (সাঃআঃ) মৃত্যুকালীন সময় মহানবীর (সাঃ) বয়স ছিল ৫২ বছর। মা খাদিজার (সাঃআঃ) মৃত্যুর পর বিশ্বনবীর (সাঃ) স্ত্রীদের বেশীরভাগই ছিলেন বিধবা নারী এবং ইয়াতিম ও অবহেলিত শিশুদের রক্ষা করার জন্যই মূলত তিনি এসব বিয়ে করেন। এ ছাড়া, যেসব সম্ভ্রান্ত নারী সারা জীবন সম্মানীত জীবনযাপন করেছেন এবং স্বামীর মৃত্যুর পর অসহায় ও হতদরিদ্র হয়ে পড়েন তাদেরকে মূলত নিরাপত্তা দেওয়া ও ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিয়েগুলো করেছিলেন রাসূলে খোদা (সাঃ)। স্বামীর মৃত্যুর পর এসব নারীর গোত্রের অধিপতিরা তাদেরকে আবার কুফুরি জীবনে ফিরে যেতে বাধ্য করছিল। যেমন, হযরত সাওদা যখন স্বামীর মৃত্যুর পর অসহায় হয়ে পড়েন তখন রাসূল (সাঃ) তাকে বিয়ে করেন। এই মহিয়সী নারী যখন হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করেন তখন তাঁর স্বামী মারা যান। এ অবস্থায় তার গোত্রের লোকেরা তাকে জোর করে কুফরির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

এই স্ত্রীদের মধ্যে এক মহিলার বয়স ছিল ৮০ বছর। ঐ ৮০ বছরের বৃদ্ধার একটি নিবেদন ছিল এই রকম যে, ঐ বৃদ্ধা কেয়ামতের ময়দানে উম্মুল মুমেনীনদের কাতারে শামিল হতে চান। ঐ বৃদ্ধার এই ইচ্ছা মহান আল্লাহ কবুল করেছিলেন বিধায় মহানবী (সাঃ) ওনাকেও ৮০ বছর বয়স হওয়া সত্বেও বিবাহ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবার কিছু বিয়ে করেছিলেন ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধ বিশ্বাস দূর করতে। তার মধ্যে একটি হল জেহেশের কন্যা হযরত জয়নাবের সঙ্গে রাসূলের বিয়ে। হযরত জয়নাব বিশ্বনবীর (সাঃ) ফুফাতো বোন ছিলেন। হযরত জয়নাবকে প্রথমে রাসূলের (সাঃ) পালকপুত্র জায়েদ বিন হারেস বিয়ে করেছিলেন এবং ওই বিয়েটি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নির্দেশেই সম্পন্ন হয়। হযরত জয়নাব ছিলেন কুরাইশ বংশের অধিপতি আব্দুল মুত্তালিবের নাতনি। অন্যদিকে জায়েদ বিন হারেস বংশগত দিক দিয়ে ছিলেন একজন ক্রীতদাস যাকে রাসূল (সাঃ) মুক্ত করে নিজের পালকপুত্রের মত সম্মান দিয়েছিলেন।

হযরত জয়নাব উচ্চ বংশ মর্যাদার কারণে সব সময় অহংকার করতেন যার কারণে ক্রীতদাস পরিবার থেকে উঠে আসা জায়েদের সঙ্গে তার সবসময় ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকত।
এমনকি এ ব্যাপারে বিশ্বনবীর (সাঃ) পরামর্শও কোন কাজে আসেনি। এক পর্যায়ে জায়েদ হযরত জয়নাবকে তালাক দেন। এ অবস্থায় আরব সমাজে প্রচলিত একটি কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে মহান আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হযরত জয়নাবকে বিয়ে করেন। আরব সমাজে তখন পর্যন্ত কোন ধরনের ধর্মীয় দলীল-প্রমাণ ছাড়াই পালকপুত্রকে আপন সন্তানের মর্যাদা দেয়া হত এবং পালক পুত্রের তালাক দেয়া স্ত্রীকে কেউ বিয়ে করত না। এ ধরনের যুক্তিহীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ প্রথা বাতিল করতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হযরত জয়নাবকে বিয়ে করেন।পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কিত বিষয় সুষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ক্রীতদাস ও যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করার জন্যও কখনও কখনও বিয়ে করেছেন।যেমন তিনি বনি মোস্তালাক গোত্রের নারী হজরত জুয়াইরিয়াকে বিয়ে করেছিলেন।

জুয়াইরিয়া মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে তার গোত্রের মানুষের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছিলেন। হজরত জুয়াইরিয়া বিশ্বনবীর (সাঃ) সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর যুদ্ধবন্দীদের অনেকেই রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আত্মীয় হয়ে যান। ফলে মুসলমানরা ওই যুদ্ধে আটক প্রায় সব বন্দীকে মুক্ত করে দেন। এ সম্পর্কে ইবনে হিশাম বলেন, “রাসূলের (সাঃ) এই বিয়ের কারণে বনি মুস্তালাক গোত্রের শতাধিক বন্দী পরিবার মুক্তি পেয়ে যায়।”রাসূলুল্লাহর (সাঃ) একাধিক বিয়ে করার আরেকটি কারণ ছিল শত্রু ভাবাপন্ন বড় গোত্রগুলোর মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। অজ্ঞতার যুগে বিভিন্ন শত্রু ভাবাপন্ন গোত্র যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের মধ্যে শত্রুতা জিইয়ে রাখত এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণহানি ঘটাতো। বিশ্বনবীর (সাঃ) এসব সামাজিক অনাচার এবং বংশ পরম্পরা শত্রুতার চির অবসান ঘটাতেও একাধিক বিয়ে করেন। 

মূলত এ ধরনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিয়ের উদাহরণ হিসেবে হযরত আয়েশা ও হযরত হাফসার সঙ্গে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বিয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। একমাত্র হজরত খাদিজা (সাঃআঃ) এবং হযরত আয়েশা ছাড়া রাসূলুল্লাহর (সাঃ) অন্যান্য সকল স্ত্রীই বিধবা ছিলেন।এবং মহানবীর (সাঃ) সঙ্গে যখন হযরত আয়েশার বিবাহ হয় তখন হযরত আয়েশার বয়স কমপক্ষে ১৬ বা ১৯ বছর ছিল। এ ছাড়া মহানবীর (সাঃ) অন্য সকল স্ত্রীগন ছিলেন বৃদ্ধা।

আর এ থেকেই প্রমাণিত হয়, রাসূল (সাঃ) কখনই দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার জন্য বিয়ে করেন নাই। বরং তিনি বিভিন্ন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এসব বিয়ে করেছিলেন যার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল।###

Share: